পৃথিবী কি কখনোই শান্ত হবে না?

 পৃথিবী কি কখনোই শান্ত হবে না?

দীপক কুমার মৃধা :
সকাল ঠিক আটটা তিরিশ মিনিট।জাপানের শহর ১৯৪৫ এর এই দিনে সকলেই ছিলেন কর্মব্যস্ত। অধিকাংশ মানুষ কাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ই সাড়ে আটটার সময়ে এমনভাবে সাইরেন বেজে উঠলো, বিষয়টা কেউ কিছু বুঝে উঠবার আগেই বিষাক্ত গ্যাসের ছোঁয়ায় দেখতে দেখতে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই লক্ষাধিক লোক লুটিয়ে পড়লো নারকীয় মৃত্যুর বুকে। দানবীয় হুঙ্কার করে পরমানু বোমা ‘লিটল বয় ‘হিরোসীমা শহরের মধ্যস্থলে আঘাত হেনেই দ্রুত পালিয়ে গিয়েছিলো, যেখান থেকে তাকে পাঠানো হয়েছিল জাপানের নিরীহ মানুষগুলোকে ধ্বংস করবার জন্যে। আকাশে নাকি হলুদ রঙের মেঘ দেখা গিয়েছিলো। হিরোসীমা শহরের আকাশ কালো ধোঁয়ার আবরণে চেয়ে গিয়েছিলো। প্রায় তেরো কিলোটন একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। কিছু বুঝে ওঠবার আগেই মানুষের অক্সিজেনকে বিনাশ করে বিষাক্ত গ্যাসের ক্রিয়া বিক্রিয়াতেই নিমেষের মধ্যেই লক্ষাধিক লোক একযোগে প্রাণত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল।

হিরোসীমার কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেলের দল তাদের অভিজ্ঞতার কথায় বলছিলো তারা হঠাৎই বেলা সাড়ে আটটা নাগাদ তিনখানা যুদ্ধবিমানকে নাকি ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিলো।তারপর সকাল সাড়ে আটটার সময়ে হিরোসীমার আকাশের বুকে দেখা গিয়েছিলো হলুদ রঙের ধোঁয়া। তার কয়েক সেকেন্ড বাদেই বীভৎসতম বোমা পতনের আওয়াজ। আকাশের বুকে সেই হলুদ রঙের ধোঁয়া ছিলো অতি বেগুনী রশ্মি। যে রশ্মি মানুষের শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে মিশে যাওয়ার সাথে সাথেই মানুষের দেহ অক্সিজেন বিহীন হয়ে পড়ে অর্থাৎ মানুষ মারা যায়।জাপানে যে বোমা ফেলা হয়েছিল টা ২৯০০০ফুট উঁচুতে একটা সুপার ফোর্ট্রেস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। জিনিসটা আস্তে আস্তে নামে আর মাটি থেকে দুই হাজার ফুট উঁচুতে বিস্ফোরণ ঘটেছিল।

বিস্ফোরণে বাতাসের যে চাপ হবে তাতে হাজার হাজার গজ দূরে থাকা ঘরবাড়ি, প্রাসাদ, অট্টালিকা গুঁড়িয়ে ধুলো হয়ে যাবে। দুই মাইল দূর থেকে মনে হবে একটা প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস বইছে, সাধারণ বাড়ি যার চাপ সইতে পারে না। হিরোসীমাতে আট মাইল দূরের বাড়িঘরদোরের কাঁচ ভেঙেছিল, ছাদ উড়েছিল। তাছাড়া সাধারণ বোমার জন্যে বিশেষ কোনো বিকিরণ হয় না, কিন্তু পরমাণু বোমার বিস্ফোরণে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের উদ্ভব হয়, তা এক সর্বনেশে জিনিস।কয়েকশো গজের মধ্যে অবস্থিত লোক পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে, তার চেয়ে কিছু দূরের লোককে অতিবেগুনী রশ্মি ঝলসে মারবে।বিস্ফোরণে যে গামা রশ্মি বেরবে, তা দেহের শ্বেতকনিকাগুলোকে ধ্বংস করবে, ফলে রক্ত জমাট বাঁধবার শক্তি হারাবে, চামড়া ভেদ করে রক্ত বের হতে থাকবে।শরীরের টিসুগুলি জখম হবে, আর তার জন্যে অনেকদিন পরেও লোক মারা যাবে। হিরোসীমা নাগাসাকিতে এই রকমের ব্যাপার ঘটেছিল। ৬ই আগস্ট ১৯৪৫, হিরোসীমাতে ১৪৪০০০এর বেশি লোক একদিনেই মারা গিয়েছিলো। ওই বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রায় আড়াই লক্ষ লোক মারা গিয়েছিলো।

তারপর আরো উনআশি বছর পার হয়ে যাওয়ার পরে ও হিরোসীমা বা নাগাসাকি শহরের বেশ কিছু মা তাদের গর্ভে আজন্ম প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন।বিনা অপরাধে প্রায় চার লক্ষ মানুষের প্রাণ চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল সেই ভয়ঙ্করতম দুই পরমানু বোমার বিস্ফোরণের ফলে। শুধু তাই নয়, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের লোকজন ও পঙ্গুরূপে জন্ম নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই নারকীয় হত্যালীলার আদৌ কি কোনো বিচার হয়েছিল? সে কথার উত্তর ইতিহাস ছাড়া অন্য কেউ কি দিতে পারবে? মানবতার এতো বীভৎসতম ধ্বংসলীলা দ্বারা জাপানকে নাকি আত্মসমর্পন করাতে বাধ্য করেছিল মিত্রশক্তি তৎকালীন সময়ে প্রায় তিন লক্ষ মানুষকে দুই দিনের মধ্যেই নরলীলা সাঙ্গ করিয়ে। এইরকম বীভৎস্যতম হত্যালীলার মাধ্যমে যুদ্ধজয় যেন আর কখনো না হয়। মানবতার এমন অপলাপ আর কোনো যুদ্ধে হয়েছিল কি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছাড়া।মাত্র দুদিনের মধ্যেই প্রায় তিন লক্ষ মানুষের জীবনবসান আর কোনো যুদ্ধে হয়েছে কিনা বলতে পারা বেশ শক্ত ব্যাপার। একমাত্র অতিমারী করোনা প্রায় ছিয়াত্তর লক্ষ মানুষের জীবন সারা পৃথিবীর বুকে শেষ করেছে। কিন্তু মাত্র দুই দিনে তিন লক্ষের বেশি মানুষকে মেরে ফেলবার ঘটনা আর অন্য কোথাও ঘটেছে কিনা তা বলা বেশ সহজসাধ্য নয়। তবুও মানুষের মনে যুদ্ধের লালসা এতটুকু হ্রাস পায় নি। প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যাচ্ছে যে এই পৃথিবী কি আর কখনোই শান্ত হবে না?

সারথি News অনলাইন