ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য — শেষ রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ চির ঘুমের দেশে: শ্রদ্ধার্ঘ্যসহ দু চার কথা
বটু কৃষ্ণ হালদার :
২২ শে শ্রাবণ আপামর বাঙালির নয়নের মনি বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের মৃত্যু দিবস।বাংলার সমস্ত জায়গা জুড়ে বাইশে শ্রাবণ পালনের কোন খামতি ছিল না। ভারাক্রান্ত হৃদয়ের বাংলার আপামর ,ভদ্র, সভ্য,শিক্ষিত সমাজের মানুষজন এই দিনটা খুবই অন্তরের সহিত পালন করে আসছে। এ বছরও স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ স্মরণে ব্যতিক্রম হয়নি। ২২ শ্রাবণ রাত পার হতেই বাঙালির ভারাক্রান্ত হৃদয় কে পুনরায় স্তম্ভিত করে দিয়ে গেল সু_সাহিত্যিক, শিক্ষিত, অতি সুশীল রাজনীতিবিদ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মৃত্যুর খবর। তাঁর মত ভদ্র রাজনীতিবিদ বাংলার রাজনীতিতে অতি বিরল,তাই তাঁর মৃত্যুতে বাংলার জনগন বিচলিত,শোকাহত। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মৃত্যুতে বাংলার বহু মানুষ মর্মাহত হয়ে তাঁর বাসভবনে গিয়ে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন। বর্তমান রাজনীতিতে এই সমীকরণটা ধরে রাখতে গেলে যে পরিমাণ ক্ষমতার দরকার হয় তা অনেক রাজনীতিবিদদের নেই।
পুরোহিত দর্পণের রচয়িতা কৃষ্ণচন্দ্র স্মৃতিতীর্থের পৌত্র,হিন্দু সারস্বত লাইব্রেরী প্রকাশনার প্রধান নেপালচন্দ্র পুরোহিতের সুযোগ্য পুত্র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণে বাংলার মানুষ শোকাহত।
তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রকে সততার সাথে কাজ করতে চেয়ে ‘চোরেদের মন্ত্রীসভায় থাকব না’ বলে মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করে যিনি ‘সময় অসময় দুসময়’ নামক নাটকের রচনা করেছিলেন সেই সাংস্কৃতিক মনস্ক ও অতি ভদ্র রাজনীতিবিদের মৃত্যুর খবর মেনে নেওয়াটা কিছুটা অসম্ভব হলেও তা সত্য। তিনি ছিলেন বাংলার অন্যতম প্রতিবাদী সাহিত্যিক সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো।
১৯৬৬ সালে কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য হোন, ১৯৬৮ সালে যুব ফেডারেশন এর সাধারণ প্রতিষ্ঠা সম্পাদক, ১৯৭১ সালে সিপিআইএম এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কমিটির সদস্য পদ লাভ। ১৯৭৭ সালে কাশিপুর বিধানসভা থেকে প্রথম জয়লাভ করে সরকারের তথ্য ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রী হন। ১৯৮৪ সালে সিপিআইএম এর কেন্দ্রীয় কমিটি তে আমন্ত্রিত সদস্য পদ লাভ, ১৯৮৫ সালে সিপিআইএম এর কেন্দ্রীয় কমিটি র স্থায়ী সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে যাদবপুর থেকে জয়লাভ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন। ১৯৯১ _ ৯৩ সালে তথ্য ও সংস্কৃতি, পুর ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৪ সালের রাজ্যের তথ্য ও সাংস্কৃতির মন্ত্রী। ১৯৯৬ সালের রাজ্যের স্বরাষ্ট্র, তথ্য ও সংস্কৃতি ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৬ সালে রাজ্যের উপ মুখ্যমন্ত্রী হন। ২০০০ সালের সিপিআইএমের পলিট ব্যুরো সদস্য পদ লাভ করেন। ৬ই নভেম্বর ২০০০ সালে পশ্চিমবঙ্গের অস্থায়ী মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৮ ই নভেম্বর ২০০১ সালে ত্রয়দশ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেন।১৮ই মে ২০০৬ সালে চতুর্দশ নির্বাচনে জয়লাভ করে মুখ্যমন্ত্রী পদে দ্বিতীয়বার বসেন। উনিশে মে ২০১১ সালে পঞ্চদশ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়। এরপরেও সিপিআইএমের পলিট ব্যুরো সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।
শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্নীতিতে ইতিমধ্যে বহু নেতা মন্ত্রী জেলের ঘানি টানছে। অথচ বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সময় প্রায় দশটি এস এস সি পরীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতিতে কোন নেতা মন্ত্রীকে জেলে যেতে হয়নি। সে সময় কোন স্কুল শিক্ষকদের চাকরি বাঁচানোর জন্যে আন্দোলন করতে হয়নি। শিক্ষিতদের চাকরি পাওয়ার জন্য আন্দোলনের নামতে হয়নি। তাদের উপর পুলিশের লাঠি চার্জ তো অনেক দূরের কথা। তবে ক্যাডার প্রথা ছিল। কেন আম বাঙালির জীবনে এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ? গ্রাম গ্রামান্তের প্রচুর সংসার এখনো স্বচ্ছল এই পরীক্ষাটির জন্য। আশি শতাংশ ছেলেমেয়েরা (বেশিরভাগ বাংলা মিডিয়ামের) আশায় বুক বেঁধে গ্রাজুয়েশন, পোস্টগ্রাজুয়েশন করত স্কুল সার্ভিস কমিশনের বসে একটা চাকরি পাবে বলে । বর্তমানে কলেজ উনিভার্সিটির বিএড কলেজগুলির আসন সম্পূর্ণ ফাঁকা। জেনারেল আর্টস ও সায়েন্স কোর্সের সিট পূরণ হয়নি আজও। গতবছর প্রথম কাউন্সেলিং এর পরও প্রেসিডেন্সির কেমিস্ট্রির সিট ফাঁকা ।পনের বছর আগে স্কুল সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দিয়ে চাকরির আশা করা যেত একটা সময়ের ব্যবধানে।
শিক্ষকতা চাকরি করার জন্য বহু বাড়ির ছেলে মেয়েরা দিনরাত পড়াশোনা করত। এখন প্রতিভার মূল্য দেওয়া হয় ?
কেন পড়বে ছেলেমেয়েরা ? এসএসসি পরীক্ষাই তো বন্ধ। শেষ হয়েছিল ৯ বছর আগে। পিএইচডির সিট যেহেতু অত্যন্ত অত্যন্ত কম এবং এসএসসি থমকে আছে বহুবছর তাই ছেলেমেয়েদের মধ্যে জেনেরাল কোর্সে পড়ার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। আর ছেলেমেয়ে ভর্তি কম হওয়ার কারণে ইউজিসি নিয়মমতো ছাত্র-শিক্ষক এর ‘অনুপাত’ এর হিসেব অনুযায়ী এক ধাক্কায় কলেজে শিক্ষকদের আসন সংখ্যাও কমে গেল।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এই সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা ও সুস্থ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবসমাজ গড়ে তোলা যারা স্বপ্ন দেখতে পারত বাংলা মিডিয়ামে পড়েও।শুধু ২০০/২৫০ টাকা দিয়ে ফর্ম তুলেই চাকরি পাওয়া যেতে পারে। এই ধারণাটা এখন নেই। রাজ্যে উন্নয়ন যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয় তবে বেকারত্বের চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে যুবক যুবতীদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা বিদায় নিলেন- আমাদের পা থাকবে মাটিতে, মাথা আকাশের প্রবক্তা আজীবন মার্কসবাদী আন্দোলন ও দর্শনে বিশ্বাসী প্রাক্তন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
আপনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই শিক্ষিত যুবক যুবতীরা ও স্বপ্ন দেখেছিল।
মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মাননীয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সর্বপ্রথম ছাত্র ছাত্রীদের জন্য সাইকেল দেওয়ার ব্যবস্থা করেন ।
মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন অবস্থায় শিল্পের মরুভূমি পশ্চিমবাংলায় নতুন করে কল কারখানা গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে টাটা কোম্পানি ন্যানো গাড়ির কারখানা করতে চেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন কারখানা তৈরি হলে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বিদ্বেষ এবং ফায়দা তোলার প্রতিযোগিতায় হলো না। পরবর্তী ক্ষেত্রে কার্যতো সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম এর জমি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত মুখ্যমন্ত্রী হলেন মমতা ব্যানার্জি।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে রক্তাক্ত আন্দোলনের ভিলেন হয়ে গেলেন বাংলাকে সাজিয়ে তুলতে চাওয়া কারিগর। সেই রক্তক্ষয় আন্দোলনের দায়ভার তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বেশিদিন তাকে সেই বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়নি।সেই কলঙ্ক থেকে হাইকোর্ট তাকে মুক্তি দিয়েছিল।
সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য ও বুদ্ধ বাবুর কথোপকথন ছিল:
কি গো? ওষুধ খাবে না? আবার সিগারেট খাচ্ছো? ডাক্তার বারণ করেছে তো।
বুদ্ধবাবু :_মন টা ভালো নেই মীরা। খবর দেখলে?
: হ্যাঁ, ভালো তো। সবাই জানল নন্দীগ্রামের ঘটনায় তোমার হাত ছিলো না। ভালো খবর।
: না গো। আমি সাবধান করেছিলাম, বলেছিলাম চক্রান্ত অনেক গভীরে। ওরা বুঝলোনা। হ্যাঁ আমাদের অনেক বদনাম, রাজ্যে শিল্পের বারোটা বেজেছে, ছেলেমেয়েরা চাকরির জন্য বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশ্বাস করো মীরা, আমি চেয়েছিলাম নতুন করে শুরু করতে, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাবসায়ী আর হাতের কাজ শেখা ছেলেমেয়েদের জন্যই সিঙ্গুরের কারখানা, নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব তৈরি করতে। ধার করে ওদের ভাতা দিতে চাইনি। চেয়েছিলাম ওদের উপার্জনের রাস্তা করে দিতে। গ্রামের সাথে শহরের যোগাযোগ বাড়িয়ে, শিল্পের সাথে অনুসারী শিল্প এনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু করতে। আর চেয়েছিলাম সরকারী কাজে লোক, আর স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ করে, নতুন আর্থ সামাজিক সংস্কার করতে। মীরা আমি হেরেই গেলাম গো। আজ হয়তো বদনাম টা নেই, কিন্ত দেখো, বিএড করে টোটো চালানো ছেলেটা আজ হেরে গেছে। কষ্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চুক্তিভিত্তিক কাজের জন্য দৌড়ানো মেয়েটা আজ হেরে গিয়েছে। আর ওদের সাথে আমিও হেরে গেছি। আমি চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি, আমায় পারতে দেয়নি।

দুদিন আগেই পাম এভিনিউ এ সন্ধ্যা নেমে আসে। দুকামরার ছোট্ট ফ্ল্যাটে ঝাপসা হয়ে ওঠে শিক্ষিত বাঙালির জন্য একদিন স্বপ্ন দেখা চোখ দুটি।কথাগুলো আজ বড্ড প্রাসঙ্গিক।
তাই সময় যত পার হবে বাংলার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুচিন্তক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মননে থাকবে।
শুধু লেনিন ট্রটস্কি নয়, লাতিন আমেরিকান সাহিত্য, মার্কেজ, কাফকা, রবীন্দ্রনাথ, বাংলা কবিতা-সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে তাঁর পান্ডিত্য ছিল অসামান্য এবং চর্চা ছিল নিরলস। সুনীল বেঁচে থাকা অবস্থায়, এখনো আবছা মনে পড়ে, বইমেলায় কৃত্তিবাসের অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসে বুদ্ধদেব, সৌমিত্র, মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে দেখেছি চুপচাপ কবিতা শুনতে (হ্যাঁ শুধু শোনার জন্য আসতেন,পাঠের জন্য নয়)।
রাজনীতিবিদদের সাহিত্য বিজ্ঞান চর্চা এখন বিরল।
একবিংশ শতকের বাংলার ইতিহাস, রাজনীতি নিয়ে যতবার আলোচনা হবে, ততবার বলা হবে- বুদ্ধদেবের আগে, বুদ্ধদেবের পরে।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একজন সৎ,শিক্ষিত,রুচিশীল রাজনীতিবিদ সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকতে পারে না। অবশ্যই তিনি একজন পথপ্রদর্শক নেতা।যুবসমাজের আদর্শ। আগামী ভবিষ্যতে যারা প্রকৃত রাজনীতিবিদ হবেন তাদের স্বপ্নে আদর্শবান রাজনীতিবিদ হিসেবেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাম সবার প্রথমে উঠে আসবে।মৃত্যু চিরন্তন সত্য। জাগতিক নিয়মের কাছে ধরা দেয় শরীরটা। যতদিন রাজনীতি বেঁচে থাকবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বেঁচে থাকবে রাজনীতির মধ্যে।কারণ তিনি সত্য তিনি পথ,তিনি আদর্শ। জীবিত অবস্থায় যেমন জনগণের জন্য কাজ করেছেন মৃত্যুর পরেও অঙ্গ দান করে গেছেন।
সারথি NEWS অনলাইন
