বাংলার ভূমিপুত্ররা প্রার্থী তালিকায় উপেক্ষিত কেন?
বটু কৃষ্ণ হালদার
এ পৃথিবীতে যখন কোন জীব জন্মগ্রহণ করেন তখন তারও একটা জন্মস্থান থাকে। যেমন বলা হয়ে থাকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের স্থান সুন্দরবন।জলদাপাড়ার গন্ডার বিখ্যাত।ওই হরিণ গুলো তমুক জঙ্গলের।
অমুক গাছে পাখিগুলো থাকার জায়গা। তেমনি মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। একজন শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তারও জন্ম ভূমি থাকে।ঠিক তেমনি এই পশ্চিমবাংলা বরাদ্দ হয়েছিল বাংলার ভূমিপুত্রদের জন্য।বাংলার ভূমিপুত্ররা স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন মৃত্যুবরণ করেছিলেন দেশছাড়া হয়েছিলেন শুধুমাত্র পশ্চিমবাংলা নয় সমগ্র ভারতবর্ষের জন্য। তবুও স্বাধীনতার লড়াইয়ে অংশগ্রহণের জন্য মুসলমানরা পুরস্কার স্বরূপ পাকিস্তান লাভ করেছিল। কিন্তু তখনো বাংলার ভূমিপুত্র দের জন্য সুরক্ষিত ছিল না পশ্চিমবাংলা। দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে এই পশ্চিমবাংলা পাকিস্তানের অংশীদার হয়ে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল। কিন্তু সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছিল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর অনুগামীরা।
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পশ্চিমবাংলা কে পাকিস্তানের থেকে ছিনিয়ে এনে ভূমিপুত্রদের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে দেন। তার জন্য অনেকটা লড়াইয়ের পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও তার অনুগামীদের। কিন্তু স্বাধীনতার ৭৬ বছর পরে বাঙালিরা এই পশ্চিমবাংলায় পরিযায়ী শ্রমিক ও উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। বাংলা বর্তমানে বহিরাগত অ_ বাঙালি ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী,সন্ত্রাসবাদি রোহিঙ্গাদের প্রধান পিঠস্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা কি হওয়ার ছিল?এর জন্য দায়ী আমাদের রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গুলো। নিজেদের ভোট ব্যাংকের স্বার্থে বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী সন্ত্রাসবাদী রোহিঙ্গাদের খুব কম পয়সার বিনিময়ে থাকা,খাওয়া, রেশনের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করে দিয়েছে।সেই সঙ্গে বাঙ্গালী ভূমিপুত্রদের কর্মস্থল দখল হয়ে যাচ্ছে। মোদ্দা কথায় বাংলার ভূমিপুত্রদের খাবারের থালায় ভাগ বসা যাচ্ছে বহিরাগত ও অনুপ্রবেশকারীরা।এর দায়ভার শুধুমাত্র তাদের নয়? ভূমিপুত্ররা তাদের দোষ ঝেড়ে ফেলতে পারেনা। কি ছিল সেই ইতিহাস একটু জেনে নেওয়া যাক।
স্বাধীনতা লাভের আত্মতুষ্টি মিলেছিল ভারত ভাগের মধ্যে দিয়ে। দেশভাগের লক্ষ্যে মুসলিম লীগ এবং হিন্দু মহাসভা গোটা ‘৪৬ সাল এবং ‘৪৭ সালের শুরুর দিকে গোটা দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চালায়, অনেকটা যেন তারই পরিণতিতে জাতীয় নেতাদের সঙ্গে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাহস্তান্তরের আলাপ আলোচনাকে এই দাঙ্গা ব্যাপক আকারে প্রভাবিত করে। পরিস্থিতি ক্ষমতা হস্তান্তরের ভাবনা কে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। যার ফলে, কংগ্রেস নেতাদের ভিতরেও এই ধারণাই শক্তিশালী হয় যে, সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে শেষ সমাধান ভারতভাগ। ভারত ভাগের মধ্যে দিয়ে উঠে আসে বাংলা ভাগের পরিকল্পনা।
সোহরাওয়ার্দী যখন অখন্ড বাংলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন শরৎ বসু, আবুল হাশেম প্রমুখদের সঙ্গে মিলে কমিউনিষ্ট পার্টির সর্বভারতীয় সম্পাদক পি সি যোশী এবং বাংলা কমিটির সম্পাদক ভবাণী সেন একটি যুগ্ম বিবৃতি দেন। বিবৃতিটি হল;
“ঐক্যবদ্ধ বাংলা গঠনের সম্ভাবনা সম্পর্কে আলোচনার জন্য মহাত্মা গান্ধী ও শরৎ বসুর সঙ্গে শাহিদ সোহরাওয়ার্দি এবং মৌলবী আবুল হাশেমের যে কথাবার্তা চলছে, তাতে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকে পরাজিত করবার নতুন পথ খোলার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমাদের মাথার উপর একটি নতুন ব্রিটিশ রোঁয়েদাদ ঝুলছে। আমাদের ধারণা, লন্ডনে বসে ভারতকে টুকরো টুকরো করবার ষড়যন্ত্র চলছে। এই পরিকল্পনা যদি কার্যকর হয়, তাহা হলে সেটা ভারতের সমস্ত সম্প্রদায় এবং সমগ্র জনসাধারণের ভাগ্যে একটা মহাবিপর্যয় হিসেবে নেমে আসবে। কংগ্রেস এবং লীগের চুক্তির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ বাংলা ব্রিটিশের নোংরা পরিকল্পনাকে বানচাল করে দেবে”।
মুসলিম লীগ দাঙ্গা পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে সাম্প্রদায়িক পরিবেশকে ভয়ঙ্কররকমের জটিল করে দেওয়ার পর পাঞ্জাব আর বাংলা ভাগের বিষয়টি প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল।বাংলায় কংগ্রেসের নীচু তলার প্রায় সবকটি কমিটিতেই হিন্দু মহাসভা অত্যন্ত কৌশলে নিজেদের লোকেদের দ্বারা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির কে সংখ্যাগরিষ্ঠ করে রেখেছিল।
হিন্দু মহাসভার কৌশলে তৈরি এইসব প্রতিবেদনের ফাঁদে পা দেয় বাংলার কংগ্রেসের প্রাদেশিক নেতৃত্ব। তাঁরা কার্যত ওইসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ‘৪৭ সালের ৪ঠা এপ্রিল বাংলাভাগের প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং সেই প্রস্তাব কার্যকর করতে নিজেদের সক্রিয় করবার সংকল্প নেয়। এর ঠিক দুই দিন পর, অর্থাৎ; ৬ই এপ্রিল বাংলা ভাগের প্রস্তাব নেয় হিন্দু মহাসভা।অল্পদিনের ভিতরেই বাংলাভাগের সমর্থনে কংগ্রেসের প্রাদেশিক শাখার পক্ষ থেকে পুস্তিকা রচনা করেন অতুল্য ঘোষ।এর অল্পকদিন পর (২৬শে এপ্রিল) দিল্লিতে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন বিধানচন্দ্র রায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এবং কিরণশঙ্কর রায়। এই বৈঠকে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন; বাংলার প্রতিনিধিরা বাংলাকে বিভক্ত করবার প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপনের জন্যে জাতীয় কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে জোর সওয়াল করবেন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিকে প্রভাবিত করবার জন্যে পূর্ববঙ্গে উচ্চবর্ণের হিন্দু অভিজাত জমিদার (তাঁওতার) কিরণশঙ্কর আর পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্ণের অভিজাত মেট্রোপলিটান হিন্দু বিধানচন্দ্র কেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে সুদূর দিল্লিতে বাংলাভাগকে নিশ্চিত করতে একান্ত বৈঠক করলেন? বাংলাভাগের প্রস্তাব যাতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি অনুমোদন করে, সেজন্যে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে, বিধানচন্দ্র এবং কিরণশঙ্কর, যৌথভাবে দৌত্য পর্যন্ত করেছিলেন নেহরু, প্যাটেল, মওলানা আজাদ, জে বি কৃপালনীর কাছে। ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনের সাথে এই তিন নেতা দেখা করার সিদ্ধান্ত ও নিয়েছিলেন। ভাইসরয়ের হাতে দেওয়ার জন্যে একটি স্মারকলিপি ও তাঁরা তৈরি করেছিলেন।
এই বৈঠকের অব্যবহিত পরেই(৪ঠা মে, দিনটা ছিল রবিবার) হিন্দু মহাসভার সমস্ত জেলা এবং মহকুমাকে বাংলাভাগের দাবিতে সভা সমাবেশের নির্দেশ দেন হিন্দু মহাসভার বাংলা শাখার সভাপতি নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পক্ষ থেকে নতুন প্রদেশের সঙ্গে যাতে কলকাতাকে যুক্ত রাখা হয়, সেদিকে প্রথমেই নজর দেওয়া হয়েছিল। আর সেই নতুন প্রদেশটি যাতে ভারতীয় ইউনিয়নের (এন সি চ্যাটার্জীর সেই সার্কুলারে ‘হিন্দুস্থান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল) অন্তর্ভূক্ত হয়, সেদিকে যাতে প্রতিটি হিন্দু মহাসভা কর্মী তীক্ষ্ম নজর রাখে, তার নির্দেশও ছিল। একদম সরাসরি হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে প্রকাশ্যে বাংলাভাগ চেয়ে আন্দোলনের নামে অরাজকতার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এন সি চট্টোপাধ্যায়। ‘৪৭ সালের ৪ঠা মে থেকে হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে।
বাংলাভাগের পক্ষে হিন্দু জনমত তৈরিতে তখন বিদ্যুৎগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে হিন্দু মহাসভা। ‘৪৭ সালের ৩০শে এপ্রিল কলকাতার বেঙ্গল ন্যাশানাল চেম্বারস অফ কমার্সে অত্যন্ত প্রভাবশালী শিল্পপতি এবং ব্যবসাদারদের বাংলাভাগের সমর্থনে সমবেত হতে আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েছিল হিন্দু মহাসভা। বেঙ্গল চেম্বারস অফ কমার্সের তৎকালীন সভাপতি ডি সি ড্রাইভার, যাঁর সাথে হিন্দু মহাসভার সম্পর্ক ছিল সুবিদিত, তিনি ছিলেন ওই সভার সভাপতি।
ঐ সভাতে বাংলাভাগের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন এন আর সরকার। দীর্ঘ ভাষণে তিনি বলেছিলেন; যদি সত্যই সোহরাওয়ার্দি ঐক্যবদ্ধ বাংলা তৈরিতে এগিয়ে আসেন, তাহলে বলতেই হয়, বিচ্ছিন্ন সেই রাষ্ট্রের কোনো ভবিষৎ আছে বলে আমরা মনে করি না।
হিন্দু মহাসভা প্রভাবিত ওই সভাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, কলকাতাসহ বাংলার হিন্দু প্রধান অঞ্চলগুলি নিয়ে একটি হিন্দু প্রধান অঞ্চল গঠন করতে হবে। নতুন সেই হিন্দু প্রধান অংশটি থাকবে ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে।
এই সভা থেকে তাঁদের আলোচনার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যে কমিটি তৈরি হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ ভাবে আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভার দ্বারা প্রভাবিত। সেই কমিটিতে ছিলেন; এন আর সরকার, বীর বদ্রিদাস গোয়েঙ্কা, ডি এন সেন, এম এল শাহ, এস সি রায়, ডাঃ এস বি দত্ত প্রমুখ (ঐ)। বাংলার বণিক সমাজের উপর হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি যে উচ্চবর্ণের, উচ্চবিত্তের হিন্দু স্বার্থের দোহাই দিয়ে, তাদের অনেকখানি প্রভাবিত করতে তখন পেরেছিল, এই কমিটির সদস্যদের নামের তালিকা থেকেই তা পরিস্কার।
এই বৈঠকের ঠিক আগের দিনই কংগ্রেসের প্রাদেশিক কমিটির পক্ষ থেকে বাংলাভাগের দাবিতে একটি স্মারকলিপি তৈরি করে, সেটি পাঠানো হয়েছিল, ভাইসরয়, নেহরু এবং প্যাটেলের কাছে। এই স্মারকলিপি এইসব ব্যক্তিত্বদের হাতে তুলে দিতে কালীপদ মুখোপাধ্যায় ৩০ শে এপ্রিল বিমানযোগে দিল্লি যান।
সংবিধান সভার সভাপতি ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ বাংলা এবং পাঞ্জাব ভাগকেই কেবল সমর্থন করেন।
সোহরাওয়ার্দি, আবুল হাশেম, শরৎ বসুর অখন্ড বাংলার বিরুদ্ধতা করে, বাংলাভাগ চেয়ে প্রায় একই ভাষাতে দুটি পৃথক বিবৃতি দেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক শাখার তৎকালী সম্পাদক সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ।
পাঞ্জাব যদি ভাগ হয়, অনতিবিলম্বে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে, এক ই সঙ্গে বাংলার মন্ত্রীসভাকেও বাতিল করতে হবে- এই দাবি র পাশাপাশি এই বঙ্গের জন্যে পৃথক মন্ত্রীসভা তৈরির দাবি সম্বলিত তারবার্তা সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া লর্ড লিস্টওয়েলের কাছে হিন্দু মহাসভার পক্ষে পাঠান শ্যামাপ্রসাদ।
এই পর্যায়ে হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের সমবেত করেন শ্যামাপ্রসাদ। ২২শে এপ্রিল বাংলাভাগের সমর্থনে দিল্লিতে শ্যামাপ্রসাদের সমর্থনে বক্তৃতা করেন ঐতিহাসিক সুরেন্দ্রনাথ সেন। ৭ই মে ডঃ যদুনাথ সরকার, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ড শিশির মিত্র বাংলাভাগের দাবি জানিয়ে লর্ড লিস্টওয়েলের কাছে তারবার্তা পাঠান। স্যার জন অ্যান্ডারসন এবং স্যার স্টাফোর্ড ক্রিপসের কাছেও তাঁরা বাংলাভাগ চেয়ে তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন।
এমনকি তথাকথিত সন্ন্যাস , বৈরাগ্য থেকে উত্থীত হয়ে বাংলাভাগের সমর্থনে লাহোরের ট্রিবিউন পত্রিকাতে বিবৃতি দিলেন অরবিন্দ ঘোষ। এই ট্রিবিউন পত্রিকাটিতেই কিন্তু বিংশ শতকের গোড়াতে প্রথম দেশভাগের দাবি তুলেছিলেন লালা লাজপত রাই। ‘৪৭ এর গোটা মে মাস জুড়ে ট্রিবিউনের প্রায় প্রতিটি খবরে বাংলাভাগের দাবির সমর্থনে জোরালো অভিমত থাকতো।দুর্ভাগ্যের বিষয় অন্নদাশঙ্কর রায় ব্যাতীত কোনো বুদ্ধিজীবীই কার্যত সেদিন দেশভাগ, বাংলাভাগের বিরোধিতা করেন নি। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সচিব হিসাবে দীর্ঘদিন কর্মরত, বিশ্বনাগরিক কবি অমিয় চক্রবর্তী পর্যন্ত বাংলাভাগকে সমর্থন করেন। সোহরাওয়ার্দি – শরৎ বসুর অখন্ড বাংলাকে তিনি ‘ধাপ্পা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এইভাবে দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার ভূমিপুত্র দের জন্য পশ্চিমবাংলার মাটি শক্তপোক্ত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই বাংলার মাটি আজ ভূমিপুত্র দের জন্য কতটা সুরক্ষিত? আরো দুর্ভাগ্যের বিষয় ব্রিটিশে যেমন ভারতবর্ষের ধন-সম্পদ লুটেপুটে নিয়ে গেছে ঠিক তেমনি বর্তমানে আমরা দেখছি এই বাংলার মাটি কর্মস্থল ধন-সম্পদ সবকিছুতে বহিরাগত ও চলে যাচ্ছে।
১৯৭৭ সালে বাংলার লাগাম উঠেছিল সিপিআইএমের হাতে। মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তৎকালীন বাংলার নয়নের মনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতি বসু।সেই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত যে সমস্ত নেতা-মন্ত্রীরা ছিলেন তাদের বেশিরভাগ এর জন্মস্থান বাংলাদেশ। নিজেদের ভূমিপুত্র দের উপর বিশ্বাস রাখতে পারেনি বাংলার জনগণ। তখন থেকেই ভূমিপুত্রা পরিযায়ী শ্রমিক ও উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়ার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করেছিল অজান্তেই। তার ফল ভুগছে পশ্চিমবাংলার ভূমি পুত্রদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সিপিআইএমের আমলে শুধুমাত্র হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ নয়, সেই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের অস্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠেছিল পশ্চিমবাংলার মাটি। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা গঠন হলেও সমস্ত সুযোগ সুবিধা পেতে শুরু করে বহিরাগত অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা। প্রায় ৩৪ বছর ধরে বহিরাগত প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জিতিয়ে এসেছে বাংলার ভূমিপুত্ররা। ভূমিপুত্র প্রার্থী না থাকা সত্ত্বেও বাংলার মানুষ ভোট দিয়ে এসেছে।
আর সেই সমস্ত নেতা-মন্ত্রীরা বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে এই বাংলা খাদ্য,অন্ন বস্ত্র,কর্মসংস্থা ও রাজনীতিতে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার পর প্রকৃত বাংলার অধিবাসীদের কথা ভুলে গিয়ে বাংলাদেশি পিরিত জেগে উঠেছিল।পশ্চিমবাংলায় একটা সার্ভে করিয়ে দেখুন কারা এ যাবত চাকরি করে গেছে। এখনো বহু বাংলাদেশিরা চাকরি করছে। আর বাংলার ভূমিপুত্র উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। আর এই সমস্ত বহিরাগত অনুপ্রবেশকারীরা ভারতের উন্নতি করনের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিজের দেশের বেড়াল পশ্চিমবাংলায় কিংবা ভারতে এসে বাঘে পরিণত হয়েছে। সেই ধারা আজও একই প্রক্রিয়ায় চলে আসছে। বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রার্থী তালিকা গুলো লক্ষ্য করুন তাতেও বহিরাগত প্রার্থীদের দখলদারী বিদ্যমান। বহিরাগত প্রার্থীরা বাংলায় আসবেন তাদের আপ্যায়ন করার জন্য এই বাংলার তহবিল থেকে ভূমি পুত্রদের করপরিসেবার কোটি কোটি টাকা খরচা করা হয়। জিতে যাওয়ার পর লক্ষ লক্ষ টাকা বাংলা থেকে নিজেদের রাজ্যে নিয়ে যায়। সিপিআইএম ৩৪ বছর ধরে বাংলার ভূমিপুত্র দের কথা ভাবেনি আর বহিরাগত প্রার্থীরা বাংলার কথা ভাববে? এসব কি ছেলে ভুলানো গল্প নয়? ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যে বাংলা থেকে কোন প্রার্থী ভোটে দাঁড়াতে দেখেছেন কখনো? তাহলে বহিরাগত প্রার্থীরা বাংলায় কেন প্রার্থী হচ্ছে ভেবেছেন কখনো বাংলার জনগণ? আর কবে ভাববেন এসব নিয়ে?
পশ্চিমবাংলায় কি কোন কর্মসংস্থান নেই? ২০১১ সালের পর থেকেই কোন চাকরি হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে।কিন্তু ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের পরেও বর্তমান সময়ে সর্বক্ষেত্রে বাংলার ভূমিপুত্রেরাই আজ বঞ্চিত উপেক্ষিত ও অবহেলিত? কলকাতা পুলিশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন পোস্ট অফিস থেকে শুরু করে স্কুল মাস্টার সব ক্ষেত্রেই বহিরাগতদের দখলদারি। পশ্চিমবাংলার ভূমিপুত্ররা রাজ্যের বাইরে দেশের বাইরে কাজ করতে গিয়ে মারা যাচ্ছে? এর জন্য ভারতীয় জনতা পার্টি কিন্তু দায়ী নয়। কারণ আজও এই বাংলায় ভারতীয় জনতা পার্টি কোনদিন ক্ষমতায় আসেনি।
এই নিয়মের পরিবর্তন দরকার
জনগণকে সচেতন হতে হবে। পশ্চিমবাংলায় নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জল করতে বহিরাগতারা কেন চাকরি করবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে? কারণ আপনি ভোট দেবেন আর আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জল করতে রাজ্য কিংবা দেশের বাইরে পাঠাবেন কেন? এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো বাংলার ভূমিপুত্রদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন।সে যে পার্টির হোক না কেনো শিক্ষিত ও ভূমিপুত্রদের এই নির্বাচনে জয়ী করে নিজের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করার দায়িত্ব আপনার।
বটু কৃষ্ণ হালদার
