কলকাতা বইমেলা ২৪ এবং আমার বই পড়া
কলকাতা বইমেলা ২৪ এবং আমার বই পড়া
কৌশিক কুমার সিংহ
৭০ সালের প্রথমের দিকেই জন্ম তৎকালীন মধ্যপ্রদেশের বিলাসপুরে, কিন্তু তারপরেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম শহরের এক কোনায় পড়ে থাকা পাড়া বেনাগেরিয়ায় , যাই হোক না কেন যেখানে নয়-দশ-এগারো সালের ভয়ংকর নকসাল আন্দোলনে আলোড়িত বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে সমাজব্যবস্থা, সেখানে ৭০ দশকের ঝাড়গ্রাম বলতে আগোছলা অবিন্যস্ত একটি অনুন্নত শহর। পড়তাম কম, দুষ্টামি বেশি, সারাদিন স্কুল করার পর এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়ানোর পর কিছুক্ষণের জন্য হলেও বই নিয়ে টানাটানির ( ছবির উপর) বিশেষ নজরদারি তে বিশেষ আগ্রহ ছিল আমার। আর তাই বই যেখানেই দেখতাম টান মারতাম। শুধু বই কেন বাড়িতে তখন দৈনিক বসুমতি সংবাদপত্র আসতো। প্রতিদিন খবর পড়ার সাথে সাথে বড় বড় খবরগুলোকে কেটে রেখে দিতাম। পরে বই আকারে প্রকাশ করব বলে ,সে রকম ভাবেই বইয়ের উপরেও ছোট থেকেই আমার একটা ঝোঁক ছিল, পরিবারে সেই সময় পারিবারিক ছাপাখানা , মানে বাড়িতেই বাবার নাম দেওয়া “প্রেস কর্নার” নামে ছাপাখানা ছিল। আমি প্রায়ই লুকিয়ে ছাপাখানা ঢুকে কম্পোজিটরের রেডি করা কম্পোস্ পরিবর্তন করে বেরিয়ে আসতাম। পরের দিন দেখতাম আমার উল্টে দেওয়ার টাইপ প্রয়োগ করার ফলে ভুল ছাপা মুদ্রন হয়েছে। এই জিনিসটা আমি করতাম আমাকে কম্পোজ করা শিখিয়ে দিত না বলে! বাড়ির ক্যাম্পাসের ছাপাখানায় বিভিন্ন স্কুল কলেজের দেওয়াল পত্রিকা, স্কুল পত্রিকা প্রকাশ পেত ,আমি টান মেরে একটা কপি নিয়ে কয়েকদিন ধরে মনোনিবেশ করে আবার দিতাম। আমার আর সেই বইয়ের উপর নজর নেই পরের বই কবে বেরোবে কে কে বই পড়ছে সেইসব জিজ্ঞাসাবাদ করতাম।
সবথেকে মজার ব্যাপার হলো পরিবারের দু তিনজন প্রচন্ড বই পড়তো। বই পোকা বললেও বেশি বলা হয় না। তারা কে জানেন ? আমার ঠাকুমা সুধিরাবালা সিংহ , তার সেজ ছেলে শ্রী প্রভাস চন্দ্র সিংহ (দুলু)আর তার স্ত্রী শ্রীমতি বন্যা সিংহ এবং অবশ্যই আর আমার দুই পিসি। একজন ব্যারাকপুর নিবাসী প্রয়াত লাল পিসি আর একজন প্রয়াত ফুল পিসি, যেখানেই দেখতাম যত ছোটই হই না কেন দেখতাম তাদের হাতে একটা পাটা বাঁধানো বই। সে উপন্যাস হোক বা গল্পের বই বা অন্য কিছু! আমি ঠিক বইটাকে নজরে নজরে রাখতাম , পেলেই বই টান মারতাম। এ ব্যাপারে সব থেকে বিরক্ত করতাম বাবাকে এবং ঠাকুমাকে। বাবা সে সময় বছরের পর বছর “দেশ”পত্রিকা পড়তো এবং ডিএম হলের ”বই” , বাবা বই পড়তো, আমি টান মারতাম, এজন্য বাবার ধমক এবং মার পর্যন্ত খেয়েছি । বই নিয়ে বদমাশি র রকমফের: ধরুন- ঠাকুমার সাত ছেলে চার মেয়ে। বিশাল সংসারে প্রধান কর্ত্রী ঠাকুরমাই। সবকিছুর উপর তার নজর কিছু ছেলে মেয়ে ৭০ দশকেই কলকাতায় পাড়ি দেয় কর্মসূত্রে বা বিবাহ সূত্রে ,আর কয়েকজন ছেলে কর্মসূত্রে ঝাড়্গ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল । প্রতিদিন দুপুরবেলায় ঠাকুমার হাতে একটা বই সে বই তিনি এতটাই মনোযোগ দিয়ে পড়তেন যে বইয়ের দুই পাতার মাঝে কাগজ ঢুকিয়ে চিহ্ন দিয়ে রাখতেন কতটা পর্যন্ত আজকে তিনি পড়েছেন, মানে কালকে তারপর থেকে আবারো বই পড়া শুরু করবে। আমি তো ঠাকুমার চিন্তাধারা বুঝতে পেরেই বদমাশি করে ১২ নম্বরের পাতার মাঝখানের টুকরো কাগজটা সরিয়ে ২৩ নম্বরে আর ২৪ নম্বরের মাঝখানে ঢুকিয়ে দিতাম (উদাহরণস্বরূপ)। ঠাকুরমা পরের দিন বই নিয়ে বসে পড়ার খেই হারিয়ে ফেলল তৎক্ষণাৎ আমি পাঁচ থেকে ঠাকুমাকে জোরে জোরে বলতে লাগলাম- আরে ঠাকুমা! তুমি তুমি আজকে বই পড়ছো না কেন? ঠাকুমা বলতো কেন জানি আগ্রহ পাচ্ছি না….. আমার বদমাশিটা ঠাকুমাকে বলে আমি তখন ঠাকুমার গতকাল যে পর্যন্ত পড়েছিল সেই পাতায় গিয়ে কাগজের টুকরোটা ঢুকিয়ে বলতাম আজকে এখান থেকে পড়ো, গতকাল এতদূর পর্যন্তই পড়া শেষ করেছিলে। ঠাকুমাও চওড়া ভার ী ফ্রেমের চশমাটা চোখের উপর বসিয়ে সাহিত্যের প্রতি একাগ্র চিত্তে মনোনিবেশ করতে শুরু করে দিল। আমার দাঁত বের করে কি হাসি, আমার খিলখিলানি শেষ হওয়ার আগেই ধরা পড়তাম দাদুর হাতে…. । সত্যিই এভাবে কলকাতা দুই পিসিকেও দেখেছি সব সময় বই পড়তে। সয়নে বসনে তাদের হাতে একটা বই… তখন বিনোদনের সঙ্গী বলতে রেডিও। কিন্তু বই তাদেরকে একটা মূল্যবোধের দিশা দেখিয়েছিল সেই দিশাতেই কি আমি আজ বই পড়তে এতই উদগ্রীব থাকি ?
যদিও বই পড়ার সময় কমছে ব্যস্ততার দরুন! তা না হলে হয়তো সত্যিই ১৯ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলার বাঁকে বিস্তার ঝুঁকি সামলে নিয়েও বই না হলেও বইয়ের আঙ্গিকে একটি লোকপ্রিয় মুখপত্র প্রকাশ করে চলেছি সমান তালে! বই আমি বরাবরই পড়তে পছন্দ করতাম সত্যি কথা বলতে ছোটবেলা থেকেই একটু দুষ্টুমির মাত্রা বেশী ছিল বলে ভরতপুর বেনাগড় শ্রীরামপুর নতুন পল্লী কোনা ডোবার সেই সময় অধিকাংশ মানুষই আমাকে ডানপিটে বলতো। বাবা সরকারি চাকরি-সুত্রের বাইরে বাইরে। মা দশটা পাঁচটা। সেই সুযোগে চূড়ান্ত বাউনদুলে। ধুর !এসে যাচ্ছে অন্য প্রসঙ্গ….. সেসব প্রসঙ্গ আসবে কোন একদিন বই নিয়ে এতটাই আমি বদ খেয়ালি ছিলাম বন্ধুর দোকানের বই তার বাড়িতে থাকলে ধার করে নিয়ে আসতাম 2-5 দিন পরে বিশেষ করে ছোটদের বই তাকে আবার ফিরিয়ে দিতাম। কারণ তাদের যে সেই সময় ঝাড়গ্রাম কেন সমগ্র জঙ্গলমহলের বিশাল ঐতিহ্যমন্ডিত বইয়ের দোকান ছিল- মদনমোহন পুস্তকালয় ! কোন কোন সময় সত্যি কথা বলতে ছোটবেলায় কথা মনে পড়লে বলতে অত্তক্তি হয় না বই কিছু কিছু ক্ষেত্রে চুরিও করেছি, যেমন বাবার ঘরে ঢুকে বই চুরি ঠাকুমার থেকে বই চুরি দাদুর খাটের নিচ থেকে বই চুরি পয়সা চুরি ছাড়াও অন্য কোথাও বইয়ের উপর হাত মারিনি।
আজ সময় হয়েছে কলকাতা বইমেলার , বইমেলার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন কিছু আমার বলার নেই কারণ কলকাতা বইমেলা শুধু নয় শীতের সন্ধ্যায় পশ্চিমবাংলার প্রায় সব জেলাতেই ছোট বড় বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে বইপ্রেমীদের বই মুখী করতে মেলা বসে চলেছে.. নানান প্রান্তে উৎসাহ দেওয়া এবং উদ্দীপনার সাথে মেলা কে সর্বাঙ্গীন সুন্দর করাটাও কর্তৃপক্ষ এবং এলাকাবাসীর একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ বইমেলা সফলতা লাভ করলে তার মানে দাঁড়ায় এলাকাবাসীর বিচক্ষণতা প্রগারতা, শিক্ষার গভীরতা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের সময়োচিত সুচিন্ঠিত প্রগতিশীল চিন্তাধারা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া।
বই -মানুষকে পড়ার মধ্যে দিয়ে এনে দিতে পারে সচেতনতা গতিশীলতা, অন্ধকার মুক্ত যুক্তিবাদী এক প্রগতিশীল সমাজ। আর নতুন বছর পড়তেই যখন কলকাতা বইমেলাকে নিয়ে আপামর বাঙালির মনে বই প্রাঙ্গণে যাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা একটু একটু করে জাগ্রত হচ্ছে তখন আমিও সেই একই ইচ্ছার পোষণ করে প্রত্যেকবারের মতো এবারও নানান আশা নিয়ে বৈকালিক পরিভ্রমণ এ বেরিয়েছি। সে যাই হোক কলেজ পাড়া সারা বছরই যাই কিন্তু এটুকু বলতেই পারি বই পড়া কিন্তু প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকে দুটো সময়। এক দুর্গাপূজার সময় আর কলকাতা বইমেলার সময়ে ।আমি বইমেলায় যাই শুধু বই কিনতে নয়। বইমেলায় যাই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে, বইমেলায় যাই নানান শিরোনাম ে সুসজ্জিত মলাটের মানে অনুধাবন করতে, বইমেলায় যাই পৃথিবীর বিদগ্ধ বাঙালিদের দূর থেকে সাহচর্য পেতে, বইমেলায় যাই বইয়ের মানে অনুভব করতে। সব থেকে বড় কথা- মোবাইল – ট্যাব বিভিন্ন প্রযুক্তি আসার পর শুনছিলাম বইমেলা ফিকে হয়ে যাবে। কিন্তু না ক্রমান্বয়ে দেখছি বইমেলা তার jaak আরো বৃদ্ধি করেছে ,বইমেলা মহামিলন প্রাঙ্গণের ধুলো ঝড় ব্যাপক আকার নিয়েছে!
সব মিলিয়ে শুধু কলকাতা বইমেলা নয়, জেলায় জেলায় বইমেলার যে ব্যাপকতা শীতের কামড়ের মাত্রা বাড়তেই প্রতিবছরের মতো এবছরও বইমেলার উন্মাদনা ও উদ্দীপনা বাড়বে এ কথা বলা যেতেই পারে। তাই আমিও একদিন দুদিন নিশ্চয়ই বাঙালির উন্মাদনার প্রাণ খোলা প্রাঙ্গন কলকাতা বইমেলায় হাজির হব, আপনাদেরও অনুরোধ করি – ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞান জানা-অজানা সহ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কে জানতে ও নানান প্রশ্ন tekhe নিরসন পেতে একবারের জন্য হলেও কলকাতা বইমেলা না হলেও জেলার কোনো না কোনো মেলায় উপস্থিত হন …আপনার স্বার্থে আপনার পরিবারের স্বার্থে। অবশ্যই দশের স্বার্থে দেশের স্বার্থে। বই পড়ুন বই পড়তে কচিকাচাদের উৎসাহিত করুন। একজন অতি ক্ষুদ্র অক্ষর-কর্মী হিসেবে আমি বলব: শুধু বই নয় সারথী জঙ্গলমহল কলকাতা দু দশকের সাড়াজাগানো মুখপত্র- সারথিসহ সব ধরনের ম্যাগাজিন সহ নিয়মিত সংবাদ মাধ্যমের উপর আলোকপাত বজায় রাখুন। দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেকে তৈরি করুন। 🙏
