আর্তনাদ by বিধানচন্দ্র হালদার

 আর্তনাদ by  বিধানচন্দ্র হালদার

আর্তনাদ

(গল্প হলেও সত্যি,
সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

বিধানচন্দ্র হালদার

শরতের আকাশ । কাশফুলের শোভা পৃথিবীকে যেন অন্য মাত্রা দিয়েছে । পুজো পুজো গন্ধ যেন আকাশে বাতাসে । মা ঘরে আসছেন । সবারই মা । বাঙালীদের এই সময় আনন্দের সীমা নেই । ঘরে ঘরে সবাই নতুন সাজে মেতে ওঠে । নতুন সাজের মোড়কে পৃথিবীকে যেন ঢেকে দিয়েছে । শুধু লাল – নীল আকাশ , মনের গহনের সীমাকে অসীমের দিকে টেনে নিয়ে যায় । শুধু টানে না বাপনকে । সে এখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে।

লিপিকা ও তপনের দারিদ্র্যের সংসার । তবু তারা সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে । বাবা – মা ভাবে বাপন বড় হয়ে তাদের অভাব অনটনের হাত থেকে নিস্তার দেবে । শত অভাবের মধ্যে বাপনকে স্কুলে পাঠাতে দ্বিধা করে না । কীভাবে সংসার চলছে বোধ করি সে কথা বিধাতা ছাড়া আর কেউ জানে না ।

বাপন স্কুল থেকে ছুটতে ছুটতে এসে মা – কে জড়িয়ে ধরে বললে , ” মা . ভোলা পুজোতে কী সুন্দর একটা জামা কিনেছে । আমাকে একটা কিনে দাও না মা । ওমা , একটা জামা কিনে দেবে মা , মাগো একটা কিনে দাও না । ” কোমরে জড়ানো নরম দুটি হাত ছাড়িয়ে কোলে তুলে নিয়ে মা বললে , “অবশ্যই কিনে দেব আমার সোনা বাপনকে” । কপালে চুমু দিল বেশ কয়েক বার ।

বাপন সংসারের কী বোঝে ? তার পক্ষে বোঝাও সম্ভব নয় । ছোটোদের কাছে একটা পুজোর জামা যে কত আনন্দের , সে কথা বোধ করি সে ছাড়া অন্য কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না । শুধু সূর্যের আলোকিত দিক সে জানে কিন্তু অন্ধকারের করুন ইতিহাস তার পক্ষে জানা সম্ভব নয় ।

আকাশের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে । এখুনি মনে হয় বৃষ্টি নামবে । তপন ও লিপিকার অন্তর আকাশের ঘোর অন্ধকারের থেকেও অধিকতর অন্ধকার । তপন তার স্ত্রীকে জানায় , ‘ জানো লিপিকা , রিক্সা নিয়ে একটু বেশী পরিশ্রম করতে হবে । দু’চার পয়সা বেশী রোজগার করতেই হবে ‘। লিপিকা হতাশ দৃষ্টিতে তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে জানায় , ‘আমাকেও একটু বেশী খাটতে হবে । কাগজের ঠোঙা বেশী বানাতে হবে । তাহলে আমিও কিছু পয়সা তোমাকে দিতে পারবো । ‘

রোজকার মতো তপন সকালে রিক্সা নিয়ে পথে বাহির হয় । তপন রোজ দুপুরে বাড়িতে ভাত খেতে আসে কিন্তু আজ সে আসেনি । প্রতিদিন দুপুরে লিপিকা খাওয়া দাওয়ার পর প্রায় ঘণ্টা খানেক ঘুমায় । আজ সে ঘুমাতে পারছে না । তার পিঠে যেন পিন ফুটছে । কত চিন্তা লিপিকার মনে জমা হয়ে থাকে । বাপন রাত ৯ টা পর্যন্ত পড়ে । পড়া শেষ করে মা – কে জানায়- “বাবা , কোথায় ? বাবা এখনো আসেনি কেন ? ” একটুকরো বরফ খন্ড নিয়ে শরীরকে স্পর্শ করলে যেমন ভাবে শরীরটা কেঁপে ওঠে । তেমনি ভাবে লিপিকা ছেলেকে বললে , ‘ এখুনি তোমার বাবা ফিরে আসবে , এই এলো বলে’ ।

লিপিকাদের বাড়ির সামনে ভ্যানের প্যাঁকপ্যাঁক আওয়াজ শোনা গেল । রাত তখন প্রায় দশটা । গ্রামের রাস্তাঘাট সন্ধ্যার সময় নিঃস্তব্ধ হয়ে যায় । কেননা , বেশীর ভাগ খেটে খাওয়া মানুষ । দিন আনে দিন খায় । তার উপর ইলেক্ট্রিক যায়নি । কেরোসিন বাঁচাতে সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে । আজ কিন্তু একমাত্র লিপিকাদের বাড়িতে আলোরছটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । তীর্থের কাকের মত দুইজন প্রাণী অপেক্ষমান । কখন বাড়ির লোক ফিরে আসবে । লিপিকার নিঃশ্বাস যেন ট্রেনের গতিতে ছুটে চলেছে গ্যালোপিন হয়ে ।

অবশেষে তপন ফিরে এল । ভ্যানের উপরে সাদা কাপড়ে জোড়ানো । মাঝে মাঝে লালের ছোপ । লিপিকা এই অবস্থা দেখে যেন পাথর হয়ে যায় । শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে । বাপন বাবার বুকের উপর জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করে । আর বলে , ‘কথা বলো বাবা , কথা বলো , বাবা , তোমার কী হল । কথা বলো বাবা , কথা বলছো না কেন ? বাবা , তোমার শরীরে এতো রক্ত কেন ? তোমার কী হয়েছে ? কথা বলছো না কেন ? ‘বাপনকে বাবার বুকের উপর থেকে টেনে আনা যাচ্ছে না । বাপনের শরীরেও রক্তের লাল দাগ লেগে রয়েছে । এ দাগ যেন মুছে যাবার নয় । এ দাগ একদিন নয় , দুদিন নয় , সারা জীবনের দাগ ।

ভ্যানচালক জানায়, আমি তপনদার কিছু দূরে ছিলাম। দেখলাম , মালবাহি বড়ো একটি ট্রাক রিক্সা সমেত ওনাকে পিষে দিল। ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত শরীরটি নিয়ে হাসপাতালে যাই । তখনও তপনদা অল্প অল্প কথা বলতে পাচ্ছে । আমি জিজ্ঞেস করলাম , ‘ তুমি তো এতো রাত্রে কোনো দিন রাস্তায় থাকো না ‘ , তপনদা করুন দৃষ্টিতে চাপা কন্ঠে জানায় , ‘ বেশি রোজগারের আশায়—আ-মার ছে-লের কি হবে ? আ-মার লি-পি-কার কি হ-বে? বলতে বলতে হঠাৎ কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে।

লিপিকার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যায় ।চারিদিক যেন অন্ধকার ।পৃথিবী যেন টলতে থাকে। লিপিকা আপন মনে ভাবতে ভাবতে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে।

সংসারে থালা-বাসন গুলি বিক্রি করে কোনো রকমে শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ মিটিয়ে ফেলে লিপিকা । বাপন নিয়মিত খুলে যায় । লিপিকা ভাবে , “ বাপনকে যে কোনো মূল্যে মানুষ করতেই হবে। লিপিকা ঠোঁঙা তৈরীর পাশাপাশি দু তিনটে বাড়িতে কাজ নিয়েছে । শুধু বাপনের মুখের দিকে চেয়ে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত লড়াই করে চলে। মা ও ছেলে মেঘ – রৌদ্রের মতো জীবন কাটাতে থাকে।

এই ভাবে দেখতে দেখতে প্রায় তিন বৎসর অতিক্রান্ত হয় । সামনে দোল পঞ্চমী আসছে। । দোলের দিনটার কথা ভাবতে থাকে বাপন । সে নানা প্লান করে ঐ দিনটা ঘিরে । বাপন ভাবে , আর দশটা ছেলের মতো রঙ মাখাবে সবাইকে, আর নিজে মাখবে । আরও কত রঙীন কল্পনা করতে তাকে বাপন আকাশের দিকে চেয়ে । গাছের ডালে একটি পাখি দেখে বাপন ভাবে , পাখি যেমন মুক্ত , সেও দোলের দিনে মুক্ত থাকবে ।

দেখতে দেখতে দোলের দিন এসে হাজির। সকাল থেকে চারিদিক হই হট্টগোল, আর রং মাখামাখি চলছে, পৃথিবী যেন রঙিন হয়ে উঠেছে। চঞ্চল হয়ে উঠেছে বাপন। তার কাছে কোনো রং নেই। বাপন ভাবে, ‘আমরা গরীব তাই মা আমাকে রং কিনে দেয়নি।’ অন্য ছেলেরা কি সুন্দর রং মাখামাখি করছে। আনন্দ, বড়লোক আর গরীব লোক মানে না। বাপনেরও খুব ইচ্ছে হলো রং খেলবে।

নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না । অপরের রঙ নিয়ে রঙে মেতে উঠলো পাড়ার ছেলের সঙ্গে । রাস্তায় যাকে দেখতে পায় তাকে রং দেয়। রঙ খেলতে খেলতে কখন বাস রাস্তায় এসে গিয়েছে বাপন জানে না । এমনই সময় একটি দ্রুতগামী ট্যাক্সি এসে বাপনকে পিষে দিয়ে চলে যায় । আজ বাপনের রঙ খেলা সার্থক হলো । নিজের লাল রঙ নিয়ে নিজে খেলছে । আর পৃথিবীটাকে মাখিয়েছে । তার রঙ আকাশে বাতাসে ঘুরপাক খেতে থাকে ।

ছেলের মৃত্যু সংবাদ যখন লিপিকার কানে গেল তখন সে চারিদিক অন্ধকার দেখতে লাগলো। হঠাৎ বিদ্যুতের শরীরে যেমন চমক লাগে লিপিকার শরীরেও তেমন শিহরণ বয়ে গেল। লিপিকা পাগলিনীর মতো শুধু বলতে থাকে, ,’বাপন, এই বাপন, একবার মা বলে ডাক ।চোখ মেলে দ্যাখ তোর মা এসেছে। এই দ্যাখ তোর জন্য কত রং নিয়ে এসেছি। তুই অভিমান করে নিজের শরীরের রং দিয়ে রং মাখলি। আমার পাগল ছেলে । একবার কথা বল্ ।একবার মা বলে ডাক্।’

লিপিকা পাগলী হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। আর আপন মনে বলতে থাকে, ‘আমার বাপনকে তোমরা কেউ দেখেছো? আমার সোনা বাপন? কোথায় আমার হীরে বাপন? কেউ কি দেখেছো আমার বাপনকে? বলনা, কেউ কি দেখেছো আমার সোনাকে……

Picture collected from Facebook