আজকে নগরায়ন এবং পরিবেশ দূষণ— একটি প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ
আজকে নগরায়ন এবং পরিবেশ দূষণ— একটি প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ।
ড. সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়।
সমাজ এবং সামাজিক জীবনের একটি উন্নত স্তর হল নগরায়ন সভ্যতার আদি পূর্বে নগর বা শহর বলে তেমন কিছু ছিল না। আর্থ বাণিজ্যিক পরিকাঠামো সঙ্গে সুর মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল সামাজিক গঠন। তার নাম গ্রাম সমাজ সময়ের গতিধারা পেরিয়ে শিল্প পুঁজির হাত ধরে এসেছে আরেক জনবসতি নাম “নগর”। এই নগর জীবন নিয়ে এসেছে নতুন সামাজিক পরিবেশ এবং জনসমাজের নতুন রূপ , এর ফলে পরিবর্তন ঘটেছে পরিবহন যোগাযোগ সহ অন্যান্য অনেক দিকের । এই পরিকাঠামাগত পরিবর্তন এবং উন্নয়ন কেবলমাত্র বাইরের রুপই পাল্টায়নি, সামাজিক সম্পর্ক চিন্তাভাবনা আদব-কায়দা সংস্কৃতি সহ সামাজিক জীবনের বিভিন্ন দিকের আঙ্গিক ও রূপেরও বদল ঘটিয়েছে। দুই.) শিল্পায়ন, পুজি কেন্দ্রিক প্রযুক্তি এবং বিশ্বায়ন পরবর্তী সুপার টেকনোলজি নগরায়নকে এক চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
নগরায়নের অপরিকল্পিত এবং প্রতিযোগিতামূলক দৌড় জনবসতি এবং অঞ্চলের বাস্তবতা ভারসাম্য নষ্ট করছে, একটি তথ্য থেকে জানা যায় ১৯৭০ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নগর বাসির সংখ্যা ছিল জনসংখ্যার ২৫.৪ ভাগ, ১৯৯০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩.৭ ভাগ । আমাদের দেশে ১৯৫১ সালে শহরবাসী সংখ্যা ছিল 19.9 শতাংশ 1951 সালে তা বের হয় ২৫.৭ শতাংশ 2011 সালের জনগণনায় তা দুই তৃতীয়াংশ বেড়েছে । সহজ করে বলা যায়- আমাদের শহর বস্তুগত অনেক সুযোগ-সুবিধা বিনোদন ও সম্ভগ এর রসদ যোগালেও জীবন ও মননের মনোরম সহজ সুন্দর পরিবেশ ও মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে থাকার পরিসরকে ক্রমশ সংকুচিত করছে । শহরে উড়ালপুল সেতুর বাহার চকচকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস, বিগ বাজার আবার এরই পাশে লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষের মাথায় ছাদ নেই । আছে আজকে এক বেলা খেয়ে বাঁচার দীর্ঘশ্বাস! এটা মানতেই হবে পরিবেশের আদর্শ অবস্থা মানে চোখ ধাঁধানো কসমেটিক্স সৌন্দর্যের মোহ নয়।
সঠিক ও আদর্শ পরিবেশ বলতে কয়েকটি দিক বোঝায় শহর বিশেষজ্ঞ এবার পরিবেশের চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন— ক. জলবায়ু খ. জৈবিক উপাদান গ.যন্ত্রপাতি ঘ. সুস্থ সামাজিক ও মানসিক পরিবেশ । কিন্তু বাস্তবের লাগামহীন উন্নয়নের দৌড় কেবলমাত্র পরিবেশ ও পরিবেশের সহজ পরিসর কে পরিচিত করছে এমনটা নয়, সঙ্গে সঙ্গে বাস্তগত ভারসাম্যও নষ্ট করছে। বায়ুমণ্ডল, আকাশ, বাতাস সবকিছুর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, এসবের জন্য আমরা দেখছি বেশি মাত্রায় বজ্রবিদ্যুৎ মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি পাহাড়ের গায়ে ধস, অসময়ে বা মৌসুমের বাইরেও ঘন ঘন ঝড় বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নগরায়নজনিত উন্নয়নের অনিয়ন্ত্রিত রূপ তৈরি করছে নানা ধরনের রোগ ভাইরাস বা জীবাণু সংক্রমণ ও মরণব্যাধি। গত দু বছরের আক্রমণের বিরুদ্ধে গোটা পৃথিবীর মানুষ লড়াই করছে । এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি নগর সভ্যতার এক সুদূরপ্রসারী প্রতিফলন বলে জীব বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে- শিল্প কারখানার উৎপাদন পদ্ধতি নির্মল বাতাসকে দূষিত করছে , বিশেষ করে কয়লা খনি অঞ্চলে মিথেন গ্যাস বজ্র পদার্থের পচন চারপাশের পরিবেশকে দূষিত করছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে মিথেন গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে প্রায় ২০ গুন বেশি ক্ষতিকারক। এছাড়া গ্রাম ও শহরাঞ্চলে নাইট্রাস অক্সাইড দূষণের মাত্রা কে বাড়িয়ে তুলেছে, এছাড়া পলিমার এবং ওই জাতীয় গলানো দ্রব্য থেকে বার হওয়া কার্বন গ্যাস পরিবেশ ও প্রতিবেশ কে বিষাক্ত করছে। তিন). পরিবেশ সংক্রান্ত প্রতিকূল প্রক্রিয়া ও প্রতিবেশ দূষণের আরো ক্ষেত্র আছে ,এর অন্যতম দিক হলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা উষ্ণায়ন। প্যারিস এবং সম্প্রতি গ্রেট ব্রিটেনের গ্লাসগো শহরে পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কার্বন গ্যাস গ্রীন হাউস গ্যাস ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির নানা দিক ও সমস্যা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি পৃথিবীর উপর চাপ দিচ্ছে গত দু দশকের এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে- অতিরিক্ত মাত্রায় যন্ত্রের ব্যবহার এবং যন্ত্রীকরন এর ফলে স্থানীয় অঞ্চলের বাতাসে নানাবিধ রাসায়নিক উপাদান মিশে যাচ্ছে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের ফাঁকে, তা শরীরের মধ্যে ঢুকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে দুর্বল করছে । দীর্ঘমেয়াদি সময়ে তা নানারকম ব্যাধিরও জন্ম দিচ্ছে, এসবের মধ্যে রয়েছে ফুসফুসের রোগ, হাঁপানি এবং ক্ষয় রোগ বা টিবি। পরিবেশকে পঙ্গু করার আরেকটা তৎপরতা প্রকাশ পাচ্ছে এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমছে বিপদের বহর এখানে শেষ নয়। একটি তথ্য থেকে জানা গেছে ফসল জ্বালানি পোড়ানো থেকে কমবেশি ৫৮ ভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড ২৪ ভাগ মিথেন এবং ১৮ ভাগ নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়। একটি হিসেব বলছে হাজার ১৯৯৭ সালে পৃথিবীর মোট গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনের মধ্যে শুধুমাত্র আমেরিকা কুড়ি ভাগ সর্বহারা করেছে। চার.) নগরায়ন, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, বিশ্বায়ন সবই নেতিবাচক এমনটা নয়, সমাজ জীবনের স্বাভাবিক গতিতে এসব প্রক্রিয়া ঘটবে কিন্তু মূল বিষয়টি হলো রাষ্ট্র সরকার এবং শক্তিধর দেশগুলির রাজনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণের সদিচ্ছা।
পৃথিবী প্রায় ধনীতম দেশ আমেরিকা এবং তার অনুসারী দেশগুলি তাদের অর্থনৈতিক দর্শন তথা পুঁজিবাদী ও পুঁজি কেন্দ্রিক নীতি ও মুনাফার উদ্দেশ্যে সফল করাই প্রধান বলে মনে করে । আমাদের খেয়াল রাখতে হবে- উন্নয়নেরও একটা অর্থনৈতিক দর্শন আছে ও থাকে, পুঁজিবাদী ও মুনাফা কেন্দ্রিক উন্নয়ন তার অন্যতম। এই কারণে আমেরিকা এবং তার অনুসারী রাষ্ট্র জলবায়ু সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কোনো রকম সহযোগিতার মনোভাব দেখায়নি ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ বা সরকারও প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেনি। নানারকম কূটনৈতিক ও দিপাক্ষিক বা ত্রিপাক্ষিক বা গোষ্ঠীভুক্ত দেশের মঞ্চে পারস্পরিক স্বার্থ বাধা হিসেবে কাজ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ তথ্য উল্লেখ করা যাক। ২০১৯ সালের পরিবেশের কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ৪১০ পি পি এম এ পৌঁছেছে এই হার ক্রমশ বাড়ছে। ১০০ বছরের মধ্যে গড় তাপমাত্রা প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে পৃথিবীতে মোট কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমন ৩৩.১ জিগাটন থেকে ৩৬.২ জিগাটন হয়েছে । ২০১৭ সালে চীন ৪.৮ জিডি এবং আমেরিকা 7.3 জিডি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন করেছে । বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, টেকনোলজি সব কিছুই স্বাভাবিক মানব জাতির জীবন ও বসবাসকে সুন্দর ও নির্মল রাখার জন্য এসবকে অস্বীকার করার কোন প্রশ্ন নেই, কিন্তু তীব্র প্রশ্ন ও প্রতিবাদ অবশ্যই থাকা চাই। প্রগতি বিরোধী ভোগবাদ ও মুনাফার প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী ভাবনা আদিকাল থেকেই মানব সমাজকে কলুষ ও বিষাক্ত করে তুলেছে এই কারণেই হয়তো কবি দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেছিলেন তার কবিতায় — “দাও ফিরে সে অরণ্য লও হে নগর”।।
