শিক্ষার অধিকার এবং দায়িত্ব

 শিক্ষার অধিকার এবং দায়িত্ব

সুব্রত কুন্ডু :

শিক্ষার অধিকার। সবার জন্য শিক্ষার প্রসার, এসব নিয়ে অনেক আলোচনাই হয়েছে। অধিকারের সঙ্গে দায় এবং দায়িত্ব থাকে এও নতুন কোনো কথা নয়। কিন্তু দায় ও দায়িত্বের সঙ্গে কাজ না করতে পারলে অধিকার কাগজেই থেকে যায়।
শিক্ষার কাজে সরাসরি যুক্ত নই। কিন্তু যেখানে কাজ করি এবং যাঁদের সঙ্গে কাজ করি তাঁরা অনেকেই শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের কাজ দেখার অনেক সুযোগ হয়েছে। কোথাও খুব উৎসাহিত হয়েছি। আবার হতাশ হয়েছি নানা কারণে। শিক্ষা বিশেষ করে প্রথাগত শিক্ষার একটা ভারি দেওয়াল তোলা ব্যবস্থা রয়েছে। ইঠ, কাঠ, পাথর, চেয়ার-টেবিল, ব্ল্যাক বোর্ড (এখন হোয়াইট বোর্ড) সিলেবাস, মিড ডে মিল, বেতন কাঠামো, শিক্ষকের অভাব, ভোটের ডিউটি, সময়ের অভাব আরো কত কী! এই ভারি দেওয়ালে কিছু শিক্ষাকর্মী, কর্তাব্যক্তি, এনজিওরা কখনো কখনো ছেদ করার চেষ্টা করছে ঠিকই। তাতে তারা সফল হয়েছে আবার ব্যর্থও হয়েছে, বেশিরভাগ সময়ে। বলা যায় ব্যার্থতার হার অনেক বেশি। মাঝে পড়ে পড়ুয়াদের শেখার এবং শিক্ষকদের শেখানোর কাজ যান্ত্রিকভাবে হয়ে চলেছে।
দেশ দুনিয়ায় যে বদল হয়ে চলেছে তার প্রতিফলন চলতি শিক্ষায় নেই। শেখানোয় নেই। শেখায় নেই। এসব নিয়ে কথা বললেই সবাই সমস্বরে বলে ওঠেন— কই, এই তো আমরা কাজের মাধ্যমে শেখা, পরীক্ষা নিরীক্ষা, হাতেকলমে শিক্ষার কত কী ব্যবস্থা করে রেখেছি। কিন্তু বিভিন্ন মূল্যায়নে, অন্যসব যদি বাদই দিই, শুধু মাত্র পড়ুয়ারা কী শিখছে তার বেহাল দশা বার বার বেরিয়ে পড়ছে। সরকারি হিসেব বলছে, ৮০ শতাংশ পড়ুয়া যারা বুনিয়াদি অংক করতে এবং বুঝে পড়তে না শিখেই তৃতীয় শ্রেণীতে পৌঁছয়। এবছরের শুরুতে যে আসার রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ১৪-১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি, বা ৫৬.৭ শতাংশ পড়ুয়ার, এক সংখ্যা দিয়ে তিন সংখ্যার ভাগ করতে সমস্যা হয়।
কিছু শিক্ষক রয়েছেন, নানা প্রতিকূলতা স্বত্বেও পড়ুয়াদের শেখানোর কাজে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরাই সরকারের শো-কেস। কিন্তু ব্যতিক্রম তো নিয়ম নয়।
এই ব্যবস্থা আর এক সহভাগী হল এনজিওরা। বহু বছর ধরে, সারা ভারতজুড়ে আনন্দময় শিক্ষা, হাতের-কলমে বা করে-দেখে শেখা নিয়ে কাজ করে চলেছে। সরকারও এখন এইসব পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার কথা বলছে। এটা এনজিওদের সাফল্য বলা যায়।
শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এনজিওরা অনেক উজ্জ্বল কাজ করলেও, নানা কারণে তাদের কাজের ধারাবাহিকতার অভাব দেখা যায়। এর মধ্যে প্রধান হল তাদের অনুদান নির্ভরতা। অর্থ, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আসে। তাই শিক্ষা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা যাবে না এটা তারা জানে। তবুও সব কাজের ক্ষেত্রে সু-স্থায়ীত্বের কথা বললেও, সহভাগী, যারা কাজটি ভবিষ্যতে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তাদের প্রায় কোনো কাজেই অন্তর্ভূক্ত করা হয় না। তারাও কাজটির গুরুত্ব বোঝে না। ফলে অর্থ বন্ধ হয়ে গেলে কাজও বন্ধ হয়ে যায়।
অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কর্মী। বিশেষ করা মাঠের নেমে যারা কাজ করে সেইসব কর্মী। এরাই এনজিওদের কাজের মেরুদণ্ড। আমি এমনটাই মনে করি। এরাই কাজ মাঠে নিয়ে যাওয়ার কুশীলব। শুধু তাই নয়। মাঠের যাবতীয় কাজের ভার তাদের হাতে। তারা পড়ুয়াদের শেখায়। শিক্ষকদের শেখায়। শিক্ষক ও সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। ডকুমেন্টেশন বা তথ্যায়নের কাজ করে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ‘সফল’ করতে ‘জোগাড়ের’ কাজ করে। সংগঠনের এবং বাইরের লোকের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে। এর মধ্যে অনেক কাজই এক-দুদিনের নোটিশে তাঁদের করতে হবে। দিনের শেষে কাজের রিপোর্ট দিতে হয়। আর কাজ না হলে জবাবদিহিও করতে হয়। এসব করতে গিয়ে মূল কাজেই ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
অন্য দিকে কর্মীদের দক্ষতার প্রশ্নও শিক্ষাসহ সব কাজেই বাধা হয়ে উঠছে। এটা প্রায় সব স্তরে রয়েছে। কোনো একটি কাজ জনপ্রিয় হলে, প্রায় সবাই সেই কাজ নকল করে নিজেদের এলাকায় করার চেষ্টা করছে। এই নকল করায় কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু স্থান, কাল, পাত্র, বিবেচনা না করে হুবহু নকল করা হচ্ছে বলে, কী করছি সে বিষয়ে কিছুটা ধারণা থাকলেও, কেন করছি, কীভাবে করছি সেসবের প্রশ্নের উত্তর প্রায় কর্মীদের কোনো স্তরেই থাকছে না। ফলে দিশাহীন কাজে প্রচুর পরিশ্রম হলেও, তা সাফল্যের মুখ দেখছে না।
শিক্ষার কাজে ধারাবাহিকতার জন্য অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ খুবই জরুরি। এজন্য এনজিওরা অনেক গালভারি কথাবার্তা বলে। কিন্তু বাস্তবে বছরে একবার মিটিং, খাওয়াদাওয়ার জন্য বাজেটে ধরা টাকা খরচ হয়ে গেলে এনজিও খুশী দাতারাও খুশী। কিন্তু কাজ এবং তার প্রভাব অনেক দিন টিকে থাকার (সুস্থায়ীত্বের) যে কথা, তা অধরাই থেকে যায়।
ইংরাজিতে একটি কথা রয়েছে ‘ম্যান ইজ আ ডকুমেন্টিং অ্যানিম্যাল’। যার সহজ অর্থ মানুষ এমন একটি প্রাণী যারা ডকুমেন্টেশন বা তথ্যায়ন করতে পারে। আর এর গভীর অর্থ হল ডকুমেন্টেশন করি বলেই আমরা অন্য জীবদের থেকে আলাদা। প্রকৃত শিক্ষার অনেকটাই ডকুমেন্টেশনের উপর ভিত্তি করে হয়। আর মানব সভ্যতাও এগিয়েছে ডকুমেন্টেশনের ওপর ভিত্তি করে। ডকুমেন্টেশনের থেকে তৈরি হয় তথ্য বা ইনফমেশন। আপনারা শুনে থাকবেন, আজকের দুনিয়ায় বলা হয়, ‘ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার’। অর্থাৎ তথ্যই শক্তি। আমি বলি, এটা যার কাছে থাকে, তার শক্তি। সবার নয়। কিন্তু এর সঙ্গে আরো একটি কথা আমি জুড়ে দিই— ‘শেয়ারিং ইনফমেশন ইজ প্রগ্রেস’। অর্থ হল, তথ্য যখন স্বতঃস্ফুর্তভাবে বিনিময় হয়, সবার জন্য উপলব্ধ হয়, তখন অগ্রগতি হয়। সবার মঙ্গল হয়। আমরাও প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করি নানা সময়ে। বলা যায়, এটা এখন একটা ফ্যাশনের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু সেই তথ্য নিয়ে কী হবে? কোন কাজে লাগবে? পড়ুয়া বা অন্য সহভাগীরা সেই তথ্য নিয়ে কী করবে? তা নিয়ে প্রায় কোনো চিন্তা ভাবনাই করা হয় না। ফলে তথ্যের ভার বাড়ে, কিন্তু কাজের ওজন বাড়ে না।
তথ্যের আরো একটা কাজ হল, ভালো, মন্দ, বা ভালোমন্দ মিলিয়ে যেখানেই কাজটি শেষ হল, সেটা সবার জন্য ব্যবহারের উপযোগী করে পেশ করা। যাতে অন্যরা সেই কাজ শুরু করতে গেলে তাদের একেবারে শূন্য থেকে না শুরু করতে হয়। ভালো-মন্দ, ভুল-ঠিক জেনে কাজ শুরু করতে পারে। পরের পদক্ষেপ নিতে পারে। বলা যায়, গবেষক যেভাবে আগের তথ্য থেকে শিখে নতুন তথ্যের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যায়, সেইভাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি, কাজ শুরুর আগে অন্য কেউ সেই কাজ নিয়ে কত দুর এগিয়েছিল, সে তথ্য পাওয়া যায় না। সেরকমই নিজেদের কাজ শেষ করার পর আমরা অন্যদের জন্য কোনো তথ্য রেখে যাই না। ফলে সবই শূন্য থেকে শুরু হয়। পণ্ডশ্রম হয়।
শিক্ষার অধিকার। তার আইন। সবার জন্য শিক্ষার প্রসার, এসব নিয়ে অনেক আলোচনাই হয়েছে। অধিকারের সঙ্গে দায় এবং দায়িত্ব থাকে এও নতুন কোনো কথা নয়। কিন্তু দায় ও দায়িত্বের সঙ্গে কাজ না করতে পারলে অধিকার কাগজেই থেকে যায়।
সারথি  নিউজ অনলাইন