জাতীয় কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ভাবাবেগের লড়াই — একুশে জুলাইয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য ২০২৪ এ কতখানি?

 জাতীয় কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ভাবাবেগের লড়াই —  একুশে জুলাইয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য ২০২৪ এ কতখানি?

বটু কৃষ্ণ হালদার :

২১ শে জুলাই বাংলা জুড়ে শহীদ দিবস পালিত হয়।জেনে নেওয়া ভালো এই দিবস কতোটা গুরুত্বপূর্ণ।১৯৯৩ সালে ২১ শে জুলাই তৎকালীন যুব কংগ্রেসের নেতৃত্বে মহাকরণ অভিযান চালানো হয়েছিল। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দাবি ছিল সচিত্র পরিচয় পত্র প্রদান করতে হবে এবং সেই সচিত্র পরিচয় পত্র দেখিয়ে ভোট গ্রহণ করতে হবে। সেই আন্দোলনকে স্তমিত করতে চালানো হয়েছিল গুলি তাতে শহীদ হয়েছিলেন প্রায় ১৩ জন জাতীয় কংগ্রেস কর্মী। পেয়ে গেলেন শহীদের তকমা। যারা সচিত্র পরিচয় পত্র প্রদানের জন্য আন্দোলন করেছিলেন সেই সরকারের আমলে ভোট লুট,ছাপ্পা প্রধান মূলধন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবার দেখে নেব এই পশ্চিম বাংলায় ২১ জুলাই শহীদ দিবসের সারমর্ম।শৌণকের লেখা থেকে উদ্ধৃতি তুলে বলতে চেষ্টা করি,২১ শে জুলাই ১৯৯৩,ঠিক কী হয়েছিলো?
২১ জুলাই কেন, কীভাবে, কী হয়েছিলো তা নিয়ে দাবি, পাল্টা দাবি আছে। আছে মতদ্বৈধতাও। অবশ্য সেটা থাকাই স্বাভাবিক। কারণ ১৯৯৩ সালের এই দিনকে কেন্দ্র করে যা যা ঘটেছিলো তার দুই প্রান্তে আছে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষজন। ‘আমরা’ ‘ওরা’-র দ্বন্দ্বে একদলের দাবি করা ‘শহিদ’ অন্যদলের চোখে নস্যাৎ হয়ে যেতেই পারে ।রাজনৈতিক একচোখামী ছেড়ে একটু নিরপেক্ষ দৃষ্টি থেকে ২১ জুলাইকে বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে এসে যায়। যে প্রশ্ন অবশ্যই যুক্তিগ্রাহ্য এবং একটু খুঁজলে হয়তো এর উত্তরগুলোও পাওয়া যেতে পারে। কী দাবিতে ২১ জুলাই?

বছরটা ১৯৯৩, তখনও জন্ম হয়নি তৃণমূলের। রাজ্য শাসন করছে জ্যোতি বসুর সরকার। সেসময় রাজ্য যুব কংগ্রেসের নেত্রী তথা সভাপতি মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। সেময় সিপিএমের বিরুদ্ধে ছাপ্পা-রিগিং-র অভিযোগ তোলে বিরোধীরা। এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ্বতা আনতে সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের দাবিতে ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন তৎকালীন রাজ্য যুব কংগ্রেসের নেত্রী তথা সভাপতি মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। প্রথমে ১৪ জুলাই কর্মসূচির দিন ঠিক হলেও পরে প্রাক্তন রাজ্যপাল নুরুল হাসানের মৃত্যুতে তা পিছিয়ে ২১ জুলাই কর্মসূচি রাখা হয়। মহাকরণ অভিযান আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিলো? বকলমে যা ছিলো ‘মহাকরণ দখল অভিযান’। ‘নির্বাচনে সচিত্র ভোটার কার্ডের আবশ্যিকিকরণ’-এর দাবিতে ডাকা ওই অভিযানের সঙ্গে রাজ্য সরকারের কর্মকাণ্ডের কোনো যোগ ছিল না। কারণ পুরো বিষয়টাই ছিলো নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত। যে কারণে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের এই আন্দোলনে সমর্থন ছিলো না। বিরোধিতা করেছিলেন কংগ্রেস নেতা তথা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিম্মা রাও। আসলে ৯২-র প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনে সোমেন মিত্র-র কাছে হারের পর দলে কোণঠাসা হয়ে পড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে নিজেকে প্রমাণের জন্য এছাড়া বিকল্প আর কোনও ভাবনাও ছিলো না। মহাকরণ অভিযানে বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। বক্তৃতা হয়েছিলো। ঝামেলা বেঁধেছিল। আচমকাই বাম সরকারের নির্দেশে গুলি চলেছিলো। তারপর থেকে ১৯৯৩ সালের এই ঘটনার পর প্রতিবছর ২১ জুলাই দিনটিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। যদিও পরবর্তীতে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। তবে ২১ জুলাই দিনটিকে আজও শহিদ দিবসের-র মর্যাদা দেওয়া হয়।
কিন্তু ঠিক কী হয়েছিলো ২১ জুলাই, ১৯৯৩ সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যেতে পারে ওই সময়ের কিছু সংবাদপত্র থেকে। যে রিপোর্টকে পক্ষপাত দুষ্টতায় দোষী করা যায়না কোনওভাবেই।

২১ জুলাই প্রসঙ্গে ২৪ জুলাই, ১৯৯৩ দি হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো –“…গণ্ডগোল তৈরিতে সদাব্যগ্র এক অংশ সমাজবিরোধী শক্তি ও গুন্ডারা অবাধ বিচরণের দিন পেয়ে গিয়েছিলো এবং তাঁদের ওপর সেই সময়ের কংগ্রেস নেতৃত্বের কোন নিয়ন্ত্রণও ছিলো না।…মহাকরণ ছাড়াও বিক্ষোভকারীরা কলকাতা পুরসভা দপ্তরে হামলা চালায়। আন্দোলনরত উত্তেজিত দলীয় কর্মীদের মোকাবিলা করতে হলে সরকারের কাছে খুব বেশী বিকল্পও খোলা না থাকলেও সময়টা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আজ থেকে ২৯ বছর আগে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এত চল ছিলোনা। ফলত প্রিন্ট মিডিয়ার এই রিপোর্টগুলো থেকে সেদিন কী ঘটেছিলো সে সম্বন্ধে একটা ধারণা করে নেওয়া খুব একটা কষ্টকর নয়।
একদম শেষে দেখে নেওয়া যেতে পারে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব, বর্তমান তৃণমূল নেতা তথা সাংসদ মণীশ গুপ্তর বয়ান। যে হলফনামায় তিনি জানিয়েছিলেন – “সেদিন ৩টি বাস পোড়ানো হয়েছিল। ৩৫টি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছিল। সব মিলিয়ে জখম হয়েছিলেন ২১৫ জনেরও বেশি পুলিশ। তাঁদের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, ডি সি (সদর), ৭জন ডি সি, ১০ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার রয়েছে। ৩৪ জন পুলিশকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশ হাসপাতালে। তাঁদের অনেকেরই পাইপগানের গুলি এবং বোমার স্প্লিন্টার লেগেছিল। তালতলা থানার সার্জেন্ট ডি কে ঘোষালের গুলি লেগেছিল। এক সাব ইনস্পেক্টর কালাচাঁদ সমাদ্দারের শরীরে আঘাত ছিল বোমার। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাব ইনস্পেক্টর এ কে গাঙ্গুলিকে এস এস কে এম হাসপাতালের সামনে মেরে মাথা ফাটিয়ে, হাত ভেঙে দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। আক্রান্ত, রক্তাক্ত হয়েছিল পুলিশ। তাই গুলি চালিয়েছিল।” কিন্তু, কার নির্দেশে গুলি চালাল পুলিশ, এপ্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। উল্লেখ্য, তৎকালীন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। পরবর্তীকালে এই ঘটনায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ক্লিনচিট দেয় সিবিআই। মুখ্যমন্ত্রী হবার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওড়িশা উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন গঠন করেন। কিন্তু তার রিপোর্ট আজও বেরোয়নি।

সারথি নিউজ অনলাইন