বাংলার পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায় কেন আজও চির বিরাজমান?

 বাংলার পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায় কেন আজও চির বিরাজমান?

বাংলার পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায় কেন আজও চির বিরাজমান?
সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

লক্ষণ রেখা কি এবং কিসের জন্য ! গত ২২শে মে বাংলার রাজা রামমোহন রায় এর জন্মদিন কেটে গেল। তথাকথিত পন্ডিত এবং অবুঝদের মধ্যে ছিল সেসময় তুমুল বাকবিতণ্ডা ও ঝগড়া ।কিন্তু বালক মাত্র ১৬ বছরের রামমোহন তৎকালীন হিন্দু ধর্মের সর্বনাশা কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে যখনি অস্ত্র ধরেছেন তখনই নেমেছে ঘোর বিরোধিতা। এটাই কুসংস্কার। ১৭৭২ সালে যিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৩৩ এর ২৭ সেপ্টেম্বর দেহত্যাগ করেন। বোধ করি তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি পিতার দ্বারা ত্যাজ্যপুত্র হয়েও সমাজের কাছে বিশাল অবদান রেখেছেন , যার তুলনাহিত। তিনি হিন্দু দেবদেবীর পূজা কে প্রাধান্য না দিলেও ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন, ঈশ্বর কে বলেছেন স্পর্শহীন-শব্দহীন রুপ রসহীন সর্বত্র বিরাজমান ও নিরাকার, নির্বিকার এবং একমেবোদ্বিতীয়ম শক্তি। রামমোহন ছিলেন জ্ঞানের আলোকবর্তিকা, নবজাগরণের পথিকৃৎ। তিনি মুক্ত আলোর বিতান ছড়ানো অত্যন্ত লড়াকু মানসিকতার মানুষ। তিনি সতীদাহ প্রথা রদ করেন লর্ড বেন্টিং এর সহায়তায়, তিনি সংস্কৃত অধ্যায়ন করেছেন আবার বাইবেলের অনেক পাঠ নিয়েছেন তার প্রথম লেখা তুহোফাট উল মূহওহিদিন ১৮০৪ সালে প্রকাশিত হয়।

কুপমুন্ডকতা,কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রতি একটা তীব্র বিদ্যুৎবনি প্রজ্জ্বলন করে সমালোচিত হয়েছেন, তিনি পদ্ম পাতায় শিশিরসম ছিলেন। তার সময়কালে অম tat sat বলা কঠিন ব্যাপার ছিল, তিনি সেখানে ঘা দিয়ে আলোড়ন তুলেছেন। তিনি তৃষ্ণার্ত বুকে চেতনার আলো দিয়ে সব বাঙালির প্রিয় হতে পারেন নি বটে কিন্তু যে নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন তা আজও বাঙালি মাত্রই হারে হারে বুঝতে পারছে বোধ করি। তার পদবী বন্দ্যোপাধ্যায় হলেও পরিচিত রায় পদবীতেই । তার বাবা রামকান্ত ছিলেন গোড়া হিন্দু, মা তারিনী দেবী ছিলেন ভীতি পরায়ণা বাঙালি গৃহবধূ। এসব উপেক্ষা করে আলো জ্বালিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন বাঙালির প্রাণে তমাসা থেকে বেরিয়ে আসার পর পথ দেখিয়েছেন রামমোহন। তিব্বতপথে অগ্রসর হতে হতে তিনি গৃহ পরিত্যাগ করলেন, রক্ষণশীল হিন্দুরা হয়ে উঠেছিলেন তার পরম শত্রু। কোন কিছুই তার যেন নাপ্যাশন ছিল রক্ষণশীল হিন্দুরা হয়ে উঠেছিলেন তার পরম শত্রু । রক্ষণশীল খ্রি রাও তার বিরুদ্ধে ছিলেন তবুও তিনি সংগ্রাম ছেড়ে দেননি তার হাত ধরেই বাংলার নবজাগরণ শুরু হয়েছিল । আজ এই সময়ে তার ২৫১ তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। তাই বলি- এখনো অনেক কুসংস্কার বাঙালি সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তার সংশোধন করতে কে এগিয়ে আসবেন এবং কবে আসবে, তার হদিস কি পাবো আমরা? আন্তর্জাতিক বাঙালি বলতে যাকে বুঝি তিনি রাজা রামমোহন , যিনি নিরন্তর অন্ধকার থেকে আলোর ঠিকানা খুঁজে বেরিয়েছেন ।জ্ঞানের আলো, চেতনার আলো, আধ্যাত্মিক মননের দিশা দেখানোর আলো জীবন বিষয়ক সংস্কার মুক্ত আলোর এক বিরাট বিস্তীর্ণ পথে নবজাগরণের আলো জ্বালাতে যেন তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীতে।

একেবারে ছোট বয়স থেকেই তিনি ছিলেন জ্ঞানের অধিকারী । তিনি হিন্দু মুসলমান এই পার্থক্য না মেনে বিখ্যাত নায়েব সিতাব রায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তখনকার অন্ধকার যুগে আলো দেখাবার পথ খুঁজে ছিলেন। তিনি বেদের উদার ব্যাখ্যা প্রকাশ পেয়ে উজ্জীবিত হন। তিনি ১৮১৫ তে আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেন, যেটা পরে ব্রাহ্মসমাজে রূপান্তরিত হয়। তিনি হিব্রু ভাষা শিখে বাইবেলের পুরানো কিছু অংশ পড়ে জ্ঞান বাড়িয়েছিলেন। ঘোষণা করলেন অবতারবাদ বর্জনীয়। তারপরে তার দাদার আকস্মিক মৃত্যুর পর প্রিয় বৌদিকে জোর করে জ্বলন্ত চিতায় তুলে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেলিত হয়েই লর্ড বেন্টিং এর সহযোগিতায় বাংলা থেকে সতীদাহ প্রথা নির্মূল করলেন। নিঃসন্দেহে তিনি বাঙালি নবজাগরণের প্রথম আলোকবর্তিকা যিনি কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়ে মুক্তচিন্তে বিহঙ্গের মতো ঘুরতে চেয়ে তমসা থেকে আলোর হদিস দিয়েছেন। উনার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । সর্বনাশা অবিকল্প নেতা হিসাবে এবং অবিস্মরণীয় পথিকৃৎ হিসেবে আমাদের মানতেই হবে । তাই আমরা তাকে নবজাগরণের রাজা হিসাবেই মানি । তাই আমাদের একমাত্র জিজ্ঞাসা -তিনি আবার আসবেন কবে ?এই বাংলায় তাঁর কর্মকাণ্ড আবহমানকাল মনে রাখবে , অবশ্যই অবশ্যই মনে রাখবে সমগ্র বিশ্ববাসী।